আপনার বাচ্চা কি একটু সময় পেলেই মোবাইল খোঁজে? খেতে বসলে মোবাইল চায়, ঘুমানোর আগে মোবাইল চায়, আবার মোবাইল সরিয়ে নিলে কান্নাকাটি শুরু করে?
এমন পরিস্থিতিতে অনেক মা-বাবাই চিন্তায় পড়ে যান। কেউ বকাঝকা করেন, কেউ মোবাইল কেড়ে নেন, আবার কেউ বাচ্চার কান্না থামাতে বাধ্য হয়ে মোবাইল দিয়ে দেন। কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, বাচ্চাকে হঠাৎ করে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ করতে বললেই সব সময় কাজ হয় না। বরং ধীরে ধীরে তার অভ্যাস পরিবর্তন করতে হয়।
আজকের লেখায় এমন ১০টি সহজ উপায় নিয়ে কথা বলব, যেগুলো আপনি ঘরেই চেষ্টা করতে পারেন।
১. হঠাৎ করে মোবাইল কেড়ে নেবেন না
বাচ্চা যদি প্রতিদিন অনেকক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করে, তাহলে একদিনেই সব বন্ধ করে দেওয়া তার জন্য কঠিন হতে পারে। তাই আগে ঠিক করুন, কখন এবং কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করা যাবে। এরপর ধীরে ধীরে সময় কমিয়ে আনুন। যেমন, বাচ্চাকে বলতে পারেন, “তুমি এই ভিডিওটা শেষ করো। তারপর আমরা একসঙ্গে অন্য একটা মজার কাজ করব।” এতে বাচ্চা বুঝতে শিখবে যে মোবাইলের বাইরেও আনন্দ করার অনেক উপায় আছে।
২. মোবাইলের বদলে অন্য কিছু করার সুযোগ দিন
বাচ্চাকে মোবাইল না দিয়ে শুধু বসিয়ে রাখলে সে আবার মোবাইল চাইবে। তাই তার জন্য অন্য কিছু করার ব্যবস্থা করতে হবে।
যেমন:
– ছবি আঁকা বা রং করা
– ব্লক দিয়ে ঘর বা বিভিন্ন জিনিস বানানো
– গল্পের বই দেখা
– পাজল মেলানো
– বল নিয়ে খেলা
– কাগজ দিয়ে সহজ কিছু তৈরি করা
বাচ্চার বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী কাজ বেছে নিন। সব বাচ্চার পছন্দ এক রকম হয় না।
৩. প্রতিদিন কিছু সময় বাচ্চার সঙ্গে কাটান
অনেক সময় বাচ্চা শুধু বিনোদনের জন্য নয়, মা-বাবার মনোযোগ পাওয়ার জন্যও মোবাইলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আপনি কাজের চাপে থাকলেও প্রতিদিন কিছু সময় শুধু বাচ্চার জন্য রাখার চেষ্টা করুন। এই সময়টাতে তার সঙ্গে গল্প করুন, খেলুন, সারাদিন কী করেছে তা শুনুন। কথা বলার সময় নিজের মোবাইলটাও পাশে সরিয়ে রাখুন। দেখবেন, ধীরে ধীরে একসঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
৪. খাওয়ানোর সময় মোবাইল না দেওয়ার অভ্যাস করুন
অনেক বাচ্চা মোবাইলে ভিডিও না দেখলে খেতে চায় না। ফলে মা-বাবাও বাধ্য হয়ে খাওয়ার সময় মোবাইল দিয়ে দেন। কিন্তু প্রতিবার খাওয়ার সময় মোবাইল দিলে বাচ্চা মোবাইল দেখেই খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে পারে। এর বদলে পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাওয়ার চেষ্টা করুন। বাচ্চার সঙ্গে গল্প করুন এবং খাবার নিয়ে তাকে সহজ প্রশ্ন করুন। প্রথম দিকে একটু সময় লাগতে পারে। তাই ধৈর্য ধরুন, জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না।
৫. ঘুমানোর আগে মোবাইল বন্ধ রাখুন
ঘুমানোর ঠিক আগে মোবাইল ব্যবহার করলে অনেক শিশুর ঘুমাতে দেরি হতে পারে। তাই ঘুমের আগে মোবাইল বন্ধ রাখার অভ্যাস তৈরি করা ভালো। ঘুমানোর আগে বাচ্চাকে গল্প শোনাতে পারেন, তার সঙ্গে দিনের ঘটনা নিয়ে কথা বলতে পারেন অথবা শান্ত কোনো কাজ করতে দিতে পারেন। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলে বাচ্চার জন্য নিয়ম মেনে চলা সহজ হতে পারে।
৬. মা-বাবাকেও নিজের মোবাইল ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে
বাচ্চারা বড়দের দেখে অনেক কিছু শেখে। আপনি যদি সারাক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করেন, তাহলে বাচ্চাকে মোবাইল কম ব্যবহার করতে বলা তার কাছে অযৌক্তিক মনে হতে পারে। তাই বাচ্চার সামনে অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করুন। পরিবারের সবাই মিলে কিছু সময় মোবাইল ছাড়া কাটাতে পারেন। এতে বাচ্চা শুধু আপনার কথা শুনবে না, আপনাকে অনুসরণ করেও শিখবে।
৭. মোবাইল বন্ধ করলে কান্নাকাটি করলেই আবার দিয়ে দেবেন না
বাচ্চার কাছ থেকে মোবাইল সরিয়ে নিলে সে রাগ করতে পারে বা কান্নাকাটি করতে পারে। তখন অনেক মা-বাবা ঝামেলা এড়াতে আবার মোবাইল দিয়ে দেন। এভাবে বারবার নিয়ম পরিবর্তন করলে বাচ্চা বুঝতে পারে যে কান্না করলেই মোবাইল পাওয়া যায়।
তাই আগে থেকেই নিয়ম ঠিক করুন এবং শান্তভাবে তা মেনে চলুন। বাচ্চা রাগ করলে তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন, কিন্তু শুধু কান্না থামানোর জন্য প্রতিবার মোবাইল দেবেন না। বকাঝকা বা মারধর না করে তাকে শান্ত হতে সাহায্য করুন।
৮. বাচ্চাকে খেলাধুলার সুযোগ দিন
বাচ্চার শুধু পড়াশোনা করলেই হয় না। তার বয়স অনুযায়ী খেলাধুলা, নড়াচড়া এবং অন্যদের সঙ্গে মিশে সময় কাটানোও দরকার। বাসায় জায়গা থাকলে নিরাপদভাবে খেলতে দিন। সম্ভব হলে পরিবারের সঙ্গে বাইরে হাঁটতে যান বা খোলা জায়গায় খেলাধুলার সুযোগ করে দিন। যে বাচ্চা বাস্তব জীবনে আনন্দ করার সুযোগ পায়, তার কাছে মোবাইলই একমাত্র বিনোদন হয়ে থাকার প্রয়োজন কমতে পারে।
৯. মোবাইল ব্যবহারের নিয়ম পুরো পরিবারের জন্য তৈরি করুন
শুধু বাচ্চার জন্য নিয়ম বানালে অনেক সময় কাজ হয় না। পরিবারের সবার জন্য কিছু সহজ নিয়ম তৈরি করুন।
যেমন:
– খাওয়ার সময় কেউ মোবাইল ব্যবহার করবে না।
– ঘুমানোর আগে মোবাইল সরিয়ে রাখা হবে।
– পড়াশোনার সময় অপ্রয়োজনীয় ভিডিও দেখা হবে না।
– মোবাইল ব্যবহারের সময় ও বিষয়বস্তু বয়স অনুযায়ী ঠিক করা হবে।
বাচ্চার বয়স অনুযায়ী নিয়ম আলাদা হতে পারে। ছোট শিশুর ক্ষেত্রে বড়দের তত্ত্বাবধানও জরুরি।
১০. বাচ্চার সঙ্গে ধৈর্য ধরুন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধৈর্য। অনেক দিন ধরে তৈরি হওয়া একটি অভ্যাস এক বা দুই দিনে বদলে যাবে, এমন আশা করবেন না। প্রথম দিকে বাচ্চা বিরক্ত হতে পারে, বারবার মোবাইল চাইতে পারে। তখন তার সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলুন। ছোট কোনো ভালো পরিবর্তন দেখলেও প্রশংসা করুন।
মনে রাখবেন, লক্ষ্য শুধু বাচ্চার হাত থেকে মোবাইল সরিয়ে নেওয়া নয়। লক্ষ্য হলো তাকে এমন কিছু অভ্যাস শেখানো, যা তার পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা ও দৈনন্দিন জীবনে কাজে আসবে।
শেষ কথা
মোবাইল এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তাই বাচ্চাকে মোবাইল থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করার চেয়ে কখন, কতক্ষণ এবং কী কাজে মোবাইল ব্যবহার করবে, তা শেখানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আজ থেকেই সব নিয়ম একসঙ্গে চালু করার প্রয়োজন নেই। প্রথমে একটি বা দুটি নিয়ম বেছে নিন। সেগুলো নিয়মিত মেনে চলার চেষ্টা করুন। এরপর ধীরে ধীরে অন্য অভ্যাসগুলো যোগ করুন। আপনার সন্তানের বয়স, আগ্রহ এবং দৈনন্দিন রুটিন বুঝে সিদ্ধান্ত নিন। প্রয়োজনে শিক্ষক বা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
আপনার বাচ্চা কি মোবাইল ছাড়া খেতে চায় না, নাকি মোবাইল বন্ধ করলেই রাগ করে? আপনার অভিজ্ঞতা পরিবারের অন্য অভিভাবকদেরও সাহায্য করতে পারে। চাইলে মন্তব্যে জানাতে পারেন।


